আস্তিক ও নাস্তিক্যবাদের দর্শন – সৈয়দ রনো (পর্ব-০২)

আস্তিক ও নাস্তিক্যবাদের দর্শন গ্রন্থ বিষয়ে পত্র

প্রিয় হৈমন্তিকা,
অগ্নিঝরা মার্চের উত্তাল একরাশ সৌরভ নিও। জানিনা আজকাল কেমন কাটছে তোমাদের দিনকাল। শুধু গাণিতিক নির্ভর কিছু সূত্র দিয়ে বুঝতে পারি, তুমিও ভালো নেই আগের মতো। আমি মুমূর্ষু ভারাক্রান্ত এক ভয়াবহ উত্তাল সময় অতিক্রম করছি। আমার ক্লান্ত সীমানায় প্রতিদিন দেখছি ছোপছোপ রক্তের দাগ। নিয়মনীতি শৃঙ্খলা যার যার ইচ্ছে স্বাধীন। শক্তির দাপটে কিছু পশুকে প্রতিদিন মানুষের পোশাকে দেখি, আর মানুষ হয়ে আছে কঙ্কাল। নীতি, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ দিন দিন বাংলার জমিন থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। ধর্মীয় অনুশাসন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে একদল পাপিষ্ঠ মহাজন। মোল্লাতন্ত্রের মনগড়া ছবকে ধর্ম নিয়ে চলছে ব্যবসা। ইসলাম ধর্মকে নিঃশেষ করার জন্য কোরআন এবং হাদিসের অপব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে করা হচ্ছে বিপথগামী। ধর্ম নিয়ে চলছে রাজনীতি, যার যার ইচ্ছে স্বাধীন অপব্যাখ্যায় ধর্মকে বিতর্কিত করবার চক্রান্তও দীর্ঘ দিনের। এসব দেখে আমি এক পাথরমানব।

হৈমন্তিকা,
আমার ভেতরের অন্তরাত্মা এখন আড়ালে আবডালে সময়ে অসময়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। বিভ্রান্তির জটাজালে ঘুরপাক খাওয়া আমি ক্লান্ত মানুষ। অনৈতিক কার্যকলাপ দেখাই যেন আমার কাজ। প্রতিবাদ করার ভাষা নেই, সামান্য মনোবল তাতেও চিড় ধরেছে অনেক আগে। কারো যেন দায় নেই, দায়িত্বও নেই। নিয়মনীতিহীন সমাজই যেন আমাদের জন্য যথাযোগ্য স্থান। উন্মাষিকতা এখানকার নিত্যদিনের হাহাকার। এই জনপদের মানুষেরা শত বিপত্তিতেও মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকাই যেন কাজ। হতাশায় তলিয়ে যাওয়া আমি, মাঝে মাঝে প্রতিবাদী হয়ে উঠি, কিন্তু কেউ আমার কথায় কর্ণগোচর করেন না।

হৈমন্তিকা,
আমরা জাতিগতভাবে এতো সু-চতুর যে, সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য দিয়ে গুলিয়ে ফেলে কার্যসিদ্ধির ওস্তাদ। অনেক কিছুর সাথেই নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারছি না বলেই এই পত্র লিখা। আমার যুথবদ্ধ কাক্সক্ষার সাথে প্রতিনিয়ত বাস্তবতার সংঘর্ষে ক্লান্ত আমি, অবসন্ন আমি। রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের সরকার, কলা-কানুন, প্রচলিত নিয়ম, সামাজিক নিয়মনীতি, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা, মানবিক মূল্যবোধ, নির্যাতন এবং নির্মমতার সাথে খাপ খাইয়ে চলাটা আমার জন্য দুরূহ হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া অঘটনে আমি পরিত্রাণের হা-হুতাসে বড্ড ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত।

হৈমন্তিকা,
কোনোভাবেই আমার বুঝে আসে না, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কেন এতো বিভাজন? কেন একদল মানুষ অন্য দলকে পথভ্রষ্ট বলছে? এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মকে তুচ্ছ ভাবছে? স্ব-স্ব ধর্মাবলম্বীদের নিকট যদি যুক্তি বা কার্যকর দলিল না থাকতো তাহলে কী তারা নিজ ধর্মে বহাল থাকতে পারতেন? কার্যত সবার কাছেই নিজ নিজ ধর্মের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিটি ধর্মের মধ্যেই আবার বিভিন্ন বিভাজন আমরা দেখতে পাই। যেমন ইসলাম ধর্মেÑ শিয়া ও সুন্নীর বিভাজন, চারটি তরিকার বিভাজনতো আছেই। খ্রিষ্টান ধর্মেÑ রোমান ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট। হিন্দু ধর্মেÑ শক্তি, বৈষ্ণব, বৈশ্ব, ক্ষত্রিয় এবং ব্রাহ্মণদের বিভাজন। বৌদ্ধ ধর্মের বিভাজন হচ্ছেÑ মহাযান, বজ্রযান এবং থেরবাদ।
এতো এতো বিভাজন দেখে আমি শুধু অবাকই নই, রীতিমতো হতবাক। বিশ্বায়নের এই যুগে মানুষ যেমন তার নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভাস, আচার-আচরণের নিজস্বতা ত্যাগ করতে চায় না, আমার কেন যেন মনে হয় তদ্রুপ জন্মসূত্রে প্রাপ্ত নিজস্ব ধর্মীয় রীতিনীতিও পরিহার করার ক্ষেত্রে ভালো-মন্দের বাছবিচার করেন না। সবাই নিজস্ব চিন্তা চৈতন্যকে প্রাধান্য দিয়ে দিনাতিপাত করতে চায়। স্রষ্টার সন্তুটি অর্জন কী সব ধর্ম পালনের মধ্য দিয়ে সম্ভব? হাজার হাজার ধর্মীয় মতবিভেদের কারণেই নাস্তিক্যবাদের জন্ম। কারণÑ আস্তিক্যবাদে যদি হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ দিক নির্দেশনা থাকে স্রষ্টার নৈকট্য লাভের তাহলে তো যুক্তিসংগতভাবেই বলা যায়, কেউ না কেউ কোন না কোনো ধর্মের মানুষ বিপথগামী। এক ধর্ম যে জিনিসটাকে হারাম বলছে, অন্য ধর্ম সেটাকে হালাল বলছে। পাশপাশি, যে বিষয়টিকে হালাল বলা হচ্ছে, সেটি অন্য ধর্ম পাপ বলে গ্রহণ করছে না। এতো বিভাজন বা বৈপরিত্য নিয়ে মাথা ঘামানো থেকেই নাস্তিক্যবাদের জন্ম। আমার এসব চিন্তা-ভাবনাকে কীভাবে দেখছো হৈমন্তিকা?

হৈমন্তিকা,
তোমাকে বলতে আজ দ্বিধা নেই, ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আমি দীর্ঘদিন ভাবি কিন্তু কিছু লিখবো এমনটি চিন্তা করিনি। পারিপার্শ্বিকতা, সময়ের নির্মমতা, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি, আস্তিক্য ও নাস্তিক্যবাদের বিভাজন আমাকে এ বিষয়ে লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে। বিভিন্ন ধর্মের কিছু ধর্মগ্রন্থ হালকাভাবে পড়েছি, যা পড়ে আমার মনে বেশ কিছু প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। সে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কখনো ধর্মগ্রন্থ কখনো দার্শনিক মতবাদ, এমনকি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রদত্ত ফর্মূলার দ্বারস্থ হয়েছি, যেখান থেকে অনুপ্রেরণা পেলাম দু-চারটি লাইন লেখার। এখন তোমার

কিছু পরামর্শই হবে আমার লেখার অনুপ্রেরণা।

হৈমন্তিকা,
তোমার আমার জন্মসূত্রে কিংবা পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া দু’টি ধর্ম নিয়ে আমরা কখনই তর্ক-বিতর্ক করিনি। তোমার ধর্ম গো-মাংশ ভক্ষণ নিষেধ করলেও তুমি গো-মাংশ ভক্ষণ করছো। আমার ধর্মে গান-বাজন শোনা নিষেধ থাকলেও আমি কিন্তু হরিসভা শুনেছি। মোটকথা, আমি তুমি, আমরা ধর্মীয় অনুশাসন শতভাগ পালন করিনি। অধিকাংশ ধর্মের আদেশ-নিষেধ এবং পালনীয় বিষয়কে মিথ অভিধায় ভূষিত করা হয়। প্রত্যেকটি ধর্মেরই রয়েছে প্রধানতম প্রাচীন ঐতিহ্য। এই প্রাচীন ঐতিহ্য বিবর্তিত হতে হতে মানুষ তার সুবিধা মতো পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন করে ফেলেছে। কাজেই, প্রায় ধর্মেই রয়েছে বিভিন্ন মতভেদ। নিজ ধর্মের রীতিনীতির ভিন্নতার সুযোগেই গড়ে উঠছে নাস্তিক্যবাদ। প্রত্যেকটি ধর্মই যদি জীবন পরিচালনার দর্শন হয়ে থাকে, সে যুক্তিতে নাস্তিকতাও একটি দর্শন যার আলোকে কিছু মানুষ জীবন পরিচালিত করতে চায়। এখন কথা হলো কোন দর্শনটি মূলত সর্বাধিক যুক্তিগ্রাহ্য এবং মানবিক, সে বিষয়ে আমরা নিরপেক্ষতা নিয়ে সাধ্যমতো তথ্য-উপাত্ত সহকারে যুক্তিসঙ্গতভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করবো। যেহেতু ধর্মীয় বিষয়, সেহেতু অধিকাংশ ধর্মের পবিত্র গ্রন্থের উদ্বৃতির আলোকে যুক্তিসঙ্গতভাবে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করবো। পাশাপাশি, নাস্তিক্যবাদের দর্শন সম্পর্কেও আমার আলোচনা করতে চাই।

হৈমন্তিকা,
আমার ভেতরে যে সকল প্রশ্নের উদ্রেক হওয়ায় এ গ্রন্থ লেখার সূত্রপাত, সে সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোচনা করা প্রয়োজন। ইতোপূর্বে তোমার সাথে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। তুমি বলেছো, মিথ্যেকে হজম করাও এক ধরণের অপরাধ। সত্যকে যুক্তিসংগতভাবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টাই হচ্ছে সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ। সত্য এবং মিথ্যাকে চিহ্নিত করণ এবং অন্তরাত্মা থেকে উত্থাপিত প্রশ্নের সমাধান খুঁজতেই এ গ্রন্থ লেখার প্রয়াস। যেসব প্রশ্ন

প্রতিনিয়ত আমাকে ভাবিয়ে তোলে, সেসব প্রশ্ন লিপিবদ্ধ করা হলো:
১। আমি কোথা হতে এলাম?
২। আমি কোথায় যাবো?
৩। আমার আত্মা পূণ:জীবিত হবে কি না?
৪। পাপ-পুন্যের বিচার হবে কি না?
৫। সৃষ্টিকর্তা আমার বিচার করবেন কি না।
৬। সৃষ্টির রহস্য কী?
৭। পৃথিবীর প্রথম মানুষ কে?
৮। মানব সৃষ্টির রহস্য কী?
৯। ধর্মীয় ভেদাভেদের কারণ কী?
১০। এতো ধর্মের প্রচলন থাকার পরেও নাস্তিকতার উদ্ভবের কারণ কী?
১১। মানুষের অন্তরাত্মা কী?
১২। ধর্মীয় আদ্যোপান্ত নিয়ে বিভেদের কারণ চিহ্নিত করণ।
১৩। ধর্মীয় অনুশাসনের বিজ্ঞানসম্মত মতবাদ।
১৪। ধর্ম দর্শন এবং বিজ্ঞানের সংজ্ঞা।
১৫। নাস্তিক্যবাদ এর আদ্যোপান্ত।
১৬। ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য।
১৭। ধর্মীয় মতভেদের কারণ চিহ্নিত করণ।
১৮। নাস্তিক্যবাদের দালিলিক গ্রহনযোগ্যতা।
১৯। ইসলাম ধর্ম ও অন্যান্য ধর্মের মানবিক মূল্যবোধ।
২০। ধর্মীয় অনুশাসনে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির যৌক্তিকতা।
২১। ধর্মীয় অনুশাসণ এবং সমসাময়িক ভাবনা।

আলোচ্য একুশটি প্রশ্নের অধিকাংশ বিষয়ের সুনির্দিষ্ট সমাধান ধর্মগ্রন্থে রয়েছে, জানি এবং মানি। কিন্তু এ সকল বিষয় নিয়েই মোটা দাগে বিতর্ক করা হয় বলে টপিক হিসেবে নির্ধারণ করা হলো। শতভাগ নিরপেক্ষতার আদলে ধর্মীয় গ্রন্থের রেফারেন্স সহ অত্র গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করবো।

হৈমন্তিকা,
অপ্রতিরোধ্য চিন্তাশক্তির অনলে জ্বলে পুড়ে খাক হয় আমার অন্তরাত্মা। বিবেক আর মনের দ্বন্দ্বে বহমান চিন্তার স্রোত। খেয়ালি মনের তান্ডবে উদ্ভাবিত জটিল এবং কঠিন প্রশ্নের সমাধান খুঁজতেই এই লেখনীর সৃষ্টি। আশাবাদী মানুষ হিসেবে, স্পষ্টভাবে আশাবাদ ব্যক্ত করতে চাই, এই গ্রন্থ হোক সু-চিন্তিত মতাদর্শের বহিঃপ্রকাশ। সুনির্দিষ্ট বক্তব্য ব্যতিত একটি গ্রন্থ কিন্তু দলিল হতে পারে না, সে বিষয়টি মাথায় রেখেই অগ্রসর হবার চেষ্টা করবো। দার্শনিক মতাদর্শ উপস্থাপনের মতো যথেষ্ট প্রজ্ঞা বা ধীশক্তি কিংবা মেধার কিঞ্চিত ঘাটতি থাকলেও মেধাবীদের উক্তিই হোক চলার বা বলার পাথেয়।

হৈমন্তিকা,
তুমি বা তোমাদের পরামর্শে আমি বা আমরা এ গ্রন্থ রচনার মধ্য দিয়ে ইহলোক বা পরলৌকিক জীবনাচার সম্পর্কে অনুধাবনের চেষ্টা করবো। বাতিল দ্বারা আক্রান্ত না হয়ে সঠিক পথ দর্শনে জীবন হোক মঙ্গলময়-সেই বাসনা রাখছি। মনুষ্য জীবন জাগ্রত হোক। সাফল্য ও কল্যাণে পরিপূর্ণতা পাক, আমার-তোমার এবং সবার জীবন। (চলবে)

অন্যধারা/সাগর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here