আস্তিক ও নাস্তিক্যবাদের দর্শন – সৈয়দ রনো (পর্ব-০১)

প্রসঙ্গ কথা : সারাটা জীবন মৌলিক লেখনি ছিলো আমার অন্যতম প্রণিধানযোগ্য কাজ। ভাবকে ভাবনায় রূপান্তর ঘটিয়ে বাস্তবতার ইজেলে পুড়িয়ে ভাইরাসমুক্ত বিষয়ের উপস্থাপন ঘটিয়েছি অনায়াসে। গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, ছড়া, পদ্য, উপন্যাস, রম্যরচনা, ভ্রমণকাহিনী, নাটক লিখেছি নিজস্ব আঙ্গিকে ও নিজস্ব শব্দের বুনটে। যে লেখনি ছিলো আমার নিজস্ব মতামত-দর্শন। লেখনির যবনিকায় নিজস্ব চিন্তাচেতনা চাপিয়ে দিয়েছি সচেতন পাঠক মহলে। কিন্তু এ গ্রন্থ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। নিজস্ব ভাবনার কোনো প্রতিফলন না ঘটিয়ে বিভিন্ন গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে সে প্রসঙ্গে দালিলিক উপস্থাপন ঘটানোর চেষ্টা করেছি মাত্র। যেহেতু আমার নিজস্ব বক্তব্যের গ্রন্থটিতে তেমন একটা প্রতিফলন ঘটছে না, শুধুমাত্র অন্যান্য গ্রন্থের আলোচনা মাত্র, সেহেতু এ গ্রন্থটিকে মৌলিক গ্রন্থ বলতে নারাজ। পৃথিবীতে সাড়ে সাত শত কোটি মানুষের ধর্মের সংখ্যা চার হাজারের উপরে। এতো এতো ধর্মীয় মূল্যবোধ এর কারণ বিশ্লেষনের প্রচেষ্টাধর্মী গ্রন্থ এটি, যেখানে মিথ প্রধান উপজীব্য। এতো ধর্ম থাকার পরেও কেন মানুষ নাস্তিক্যবাদে ভোগেনÑ এ বিষয়টিই মূলত গ্রন্থটির আলোচ্য বিষয়।

বিজ্ঞানের পরিভাষায় প্রত্যেকটি প্রাণি বা বস্তুর একটি মৌলিকত্ব থাকে, যা থেকে বিচ্যুতি ঘটলে প্রাণী বা বস্তু তার নিজস্ব সত্তা হারিয়ে ফেলে। বিজ্ঞানের এই থিওরী থেকে বোঝা যায়, মানুষ তার মূলকে আঁকড়ে না থাকতে পারলে তার ধর্মের পরিবর্তন ঘটে। বিজ্ঞানের ফর্মুলা অনুযায়ী প্রত্যেক বস্তুরই একটি নিজস্ব ধর্ম থাকে, যা অপরিবর্তিত কিন্তু ধর্মের পরিবর্তন ঘটলে অন্য বস্তুর সাথে মিশে বস্তুর নিজস্বতা হারিয়ে ফেলে। ই তত্ত্বের আলোকে মানুষ প্রতিনিয়ত তার মৌলিকত্ব বা নিজস্বতার পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। কাজেই অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিয়ে তত্ত্ব-উপাত্তের গবেষণালব্ধ ফসলই হচ্ছে এ গ্রন্থের প্রধান বিষয়বস্তু। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি, অপার বাসনা, অজানা সম্পর্কে জানার ব্যাপক কৌতুহল থাকলেও সাধ এবং সাধ্যের মধ্যে পরিমিত শক্তির কারণেই যতো বিপর্যয়। চাহিদা এবং বাস্তবতার মধ্যে আশাতীত দূরত্ব মানুষকে ভাবনায় নিপতিত করে। জানার অদম্য কৌতুহল খুবলে খুবলে খেলেও মানুষ সুনির্দিষ্ট গন্ডি অতিক্রম করতে পারে না। এটা সৃষ্টির রহস্য আবৃত ঘটনা।

মীমাংসিত একটি বিষয়কে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে বিতর্ক সৃষ্টি করার নাম দর্শন শাস্ত্র নয় বরং প্রশ্ন তৈরি হলে সেই উত্থিত প্রশ্নকে সমাধানের রাস্তা তৈরি করার নাম দর্শন। এ যুক্তিতে “আরজ আলী মাতুব্বর এর রচনা সমগ্র” আমার দৃষ্টিতে কোনো নতুন মত বা পথের দিক নির্দেশনা দেয়নি। এ গ্রন্থে মোটা দাগে আলোচনা করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, আরজ আলী মাতুব্বর এর রচনা সমগ্র কোনো দর্শন নয়। মানুষের জীবন ধারণের কোনো বিধি-বিধান তিনি উত্থাপিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বরং ধর্ম-দর্শন-বিজ্ঞান সম্পর্কে তার অন্তরাত্তার জানার তীব্র বাসনার প্রতিফলন ঘটেছে সমগ্র গ্রন্থে।

পাশাপাশি, আরিফ আজাদ এর ‘আরজ আলী সমীপে’ গ্রন্থটি আরজ আলীর উত্থাপিত প্রশ্ন সমূহ খন্ডন করার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক দালিলিক উপস্থাপন ঘটাতে সক্ষম হলেও আমার কাছে মনে হয়Ñ মৃত ব্যক্তির কাছে জানার কৌশল অবলম্বনের প্রক্রিয়াও শতভাগ প্রণিধানযোগ্য নয়। মরহুম আরজ আলী মাতুব্বর সাহেবের ‘সত্যের সন্ধ্যানে’ গ্রন্থের যুক্তিসম্মত তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হলেও আর একটু অভিনব কৌশল অবলম্বন হলে আমাদের অন্তর-আত্মার খোরাক জুটতো নিঃসন্দেহে। যাক, কোনো প্রচেষ্টাকে অবজ্ঞা করার মতো যথেষ্ট সামর্থ আমার আছে বলে মনে করি না। এ গ্রন্থে আরজ আলী মাতুব্বর সাহেবের মতো পৃথিবীর সমস্ত ধর্ম কিংবা ইসলাম ধর্মকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করার মতো ইচ্ছা বা মনোবাসনা কোনোটাই আমার নেই। পাশাপাশি, আরিফ আজাদ সাহেবের খেয়ালÑ ইসলাম ধর্মকে সঠিক উপস্থাপন করার জন্য আঁটঘাট বেঁধে নামার মধ্যেও সার্থকতা দেখছি না। কারণ, ইসলাম ঐতিহাসিকভাবে পরীক্ষিত একটি শান্তির পথ। আমি এ গ্রন্থ লেখার ক্ষেত্রে শুধু বিভিন্ন রেফারেন্স বা উদ্ধৃতি ব্যবহার করবো, এতে সচেতন পাঠক তার নিজের মতো করে বুঝে নিবেন।

কুরআন, পুরান, ত্রিপিটক, গীতা, ইঞ্জিল, যাবুর, তাওরাত, আরজ আলী সমীপে, আরজ আলী মাতুব্বর রচনা সমগ্র- ১, ২, ৩ উল্লেখিত শাস্ত্রসমূহ পাঠান্তে এ গ্রন্থ রচনার প্রেরণা পেলাম। কোনো ধর্মকে ছোট বা বড় করবার অভিলাসে এ রচনার কাজে মনোনিবেশ করিনি। আস্তিক ও নাস্তিক্যবাদের মতাদর্শে কোনো পক্ষ অবলম্বনও এ গ্রন্থের দর্শন নয়। কাউকে ব্যথিত করার জন্য কিংবা কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করাও আমার মানসিকতার মধ্যে পড়ে না। মূলত আমার জানা বিষয়টি অন্যের সাথে শেয়ার করতেই হাতে কলম তুলে নিলাম। এ গ্রন্থ হয়তোবা পাঠকের মনে বিন্দুমাত্র রেখাপাত করতে পারবে না কিন্তু যেহেতু ঈশ্বর ও নিরশ্বরবাদ সম্পর্কে কিছুটা পঠন-পাঠন করেছি সেহেতু কিছু লেখা আমার নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন এ গ্রন্থটি পাঠকের মনে তেমন একটা রেখাপাত করবে না? উত্তরে বলবোÑ বিষয়টি অতীব প্রাচীন, এ বিষয় নিয়ে শত শত হাজার হাজার পণ্ডিতজন ইতোমধ্যে লিখেছেন, তাই আমার এ লেখা তেমন একটা নতুন কিছু নয়। ধর্ম নিয়ে যুক্তিতর্ক, বিভিন্ন প্রশ্ন আজ নতুন করে উত্থাপিত হচ্ছে তাও নয়। বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবার যেমন সুযোগ রয়েছে, তদ্রুপ যৌক্তিকভাবে সমাধানের রাস্তাও কিন্তু দার্শনিক মতবাদের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে। সবকিছুই মূলত মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির সাথে, মানুষের বাস্তবসম্মত সীমাবদ্ধতার বিস্তর ফারাকই হচ্ছে ভ্রান্ত মতাদর্শের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।

অনেকেই মনে করতে পারেন, এ গ্রন্থ আস্তিক ও নাস্তিকদের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়াবে। আমি বলবো হয়তো না, বরং কমিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। নাস্তিকতার দর্শন এবং বিজ্ঞান মনষ্ক ভাবনাকে গুলিয়ে ফেলার যে মতাদর্শ এটা কতটুকু যৌক্তিক সে সম্পর্কে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করবার অনন্ত চেষ্টার ফসল এ গ্রন্থ। পৃথিবী মহাশক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়, প্রকৃতির নিয়মানুবর্তিতা দ্বারা পৃথিবী পরিচালিত হয়, সৃষ্টিকর্তা দ্বারা পৃথিবী পরিচালিত হয় Ñএই তিনটি বিষয় হচ্ছে বিভ্রান্তির কিংবা বিভাজনের মূল উৎস, যা সম্পর্কে যৌক্তিক একটি ধারণার মধ্যে আসা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। বিভ্রান্তি, বিভাজন সৃষ্টি করা কোনো সফল কাজ নয়। বরং সত্য ও সুন্দর সর্বজন স্বীকৃত একটি পথের আবিষ্কার করাই গবেষকের কাজ। বিভাজনের প্রশ্নবোধক চিহ্ন পাশ কাটিয়ে যাওয়া মূর্খতা বা অজ্ঞতা। সকল প্রশ্নের দালিলিক ইতিহাস সমৃদ্ধ উত্তর দেয়াটাই দার্শনিক মতবাদ। দর্শনশাস্ত্র একপেশে মনোভাবাপন্ন কোনো বিষয় নয়। দর্শনশাস্ত্র হচ্ছে অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের উপস্থাপন।

সকল মতাদর্শের মানুষের প্রতি বিনীত শ্রদ্ধা রেখেই এ গ্রন্থের প্রতিটি বাক্য গঠন করা হয়েছে। কারো না কারো নিকট গ্রন্থের নিরপেক্ষতার মান ক্ষুন্ন হবে কারণ, এ মতপার্থক্য কিন্তু আজকের নতুন নয়। সবার কাছে একটি মতাদর্শ বা ধর্ম যদি গ্রহণযোগ্য হতো তাহলে এতো এতো ধর্মের উদ্ভব হতো না। কার্যত যা বলতে চাই, সে বিষয়ের সার্বিক গ্রহনযোগ্যতা নিয়ে ভেবে চিন্তে বলাই শ্রেয়। আমি নিজেই সব বুঝি, এ পৃথিবীর আর কোনো মানুষ আমার মতো বুঝে না, এমন ভাবনাতেই হচ্ছে মূল সমস্যা!
সমস্যা যদি চিহ্নিত করা যায় তাহলে সমাধানের রাস্তা বের করা তুলনামূলক সহজ হয়। ধর্মীয় মতপার্থক্যের মূল সমস্যা চিহ্নিত করে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের বর্ণনা মতে তা সমাধানের চেষ্টা করলে মতোভেদ অনেকাংশে কমে আসবে, এরপর নাস্তিকতা এবং আস্তিকতা সম্পর্কে বিশ্লেষণ করে সমাধানের যৌক্তিক রাস্তা বের করা। ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসীদের প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়:
১. আসমানী ধর্মগ্রন্থ অনুসারী
২. মানব রচিত ধর্মগ্রন্থ
৩. অলিখিত ধর্মীয় অনুসারী বিশ্বাসী।
প্রচলিত প্রথা, উৎসব পালন বা বংশ পরম্পরায় পালনীয় ঐতিহ্যে বিশ্বাস স্থাপনকারী, আল্লাহ-খোদা, ভগবান, সৃষ্টিকর্তা বা স্রষ্টা, গড-ঈশ্বর কিংবা অদৃশ্য বা দৃশ্যমান কোনো মূর্তি, শক্তি, বস্তু, আগুন, পানি, মাটি, পাহাড়-পর্বত, দেব-দেবী ইত্যাদির প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ আস্তিক। সৃষ্টিকর্তা বা মহান কোনো শক্তির অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা না করে অবজ্ঞা পোষনকারীরাই হচ্ছেন নাস্তিক। অন্যভাবে বললে বলা যায়Ñ পরকাল সম্পর্কে বিশ্বাস স্থাপন করে পাপ-পূণ্যের বিচারের ভয়ে কোনো শক্তির কাছে নত হওয়াই হচ্ছে আস্তিক্যবাদ। নাস্তিক্যবাদ হচ্ছে, মানুষের মৃত্যুরপর অন্য কোনো জীবন নেই, মহাশক্তির কোনো অস্তিত্ব নেই, পৃথিবী প্রাকৃতিক নিয়মে পরিচালিত হচ্ছে এরূপ মতাদর্শন পোষণ কারী। তবে একথা সত্য যে, সকল ধর্মই কিন্তু সত্য ও সুন্দরের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিপক্ষে। সকল ধর্মই মিথ্যাচার পরিহারের কথা বলে। অধিকাংশ ধর্মের মূলমন্ত্র হচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ। তবে নাস্তিকতাও কিন্তু অমানবিকতার চর্চা করে না। ধর্মীয় অনুশাসন মানুষকে লোভ-লালসা হতে পরিত্রাণের রাস্তা দেখায়। নাস্তিক্যবাদ বলে মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ, মানুষই মহান। মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই।

গুরুত্বসহকারে আলোচনার প্রয়োজন হলো সংখ্যা বিচারে অধিক জনগোষ্ঠীর পালনীয় বড় বড় ধর্ম ব্যতিরেকে ছোট ছোট নৃগোষ্ঠী বা উপজাতি দ্বারা পালনীয় ধর্মের সত্য, সুন্দর, ন্যায়নিষ্ঠা এবং মানবিক দিকগুলো নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী মূল্যায়ন। কারণ, নাস্তিক্যবাদ অমানবিকতার পক্ষে নয়, সত্য সুন্দর এবং ন্যায়পরায়ণতার কথা বলে। মানুষকে প্রথমত হিংস্রতার পথ পরিহার করে সভ্যতার দিকে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষকে হতে হবে মানবিক, ন্যায়পরায়ণতার, সত্য সুন্দর সভ্যতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ধর্ম-কর্ম কিংবা অধর্মের নামে হিংস্রতার পথ পরিহার করার মূলমন্ত্রে এ গ্রন্থ রচনার চেষ্টা করবো। মানুষের কাম, ক্রোধ, হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা ইত্যাদি পরিহারের চর্চা প্রকৃত মানুষ হবার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

ভূমিকা আর দীর্ঘ করা অবিবেচ্য হবে। পক্ষপাতিত্বের উর্ধ্বে উঠে লেখনিকে কতোটুকু সার্বজনীন করা যায়, সেরূপ অলিখিত একটি চ্যালেঞ্জ নিয়েই প্রতিনিয়ত নিজের সাথেই নিজের, মনোযুদ্ধে লিপ্ত হলাম। গ্রন্থের সঠিক মূল্যায়নের ভার সুচিন্তিত পাঠকের উপর ছেড়ে দেয়াই শ্রেয়। অনাকাঙ্খিত ভুল-ত্রুটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া আর উচ্চমার্গীয় শব্দ আমার জানা নেই। সকলের তাত্ত্বিক পরামর্শ আগামী দিনে গ্রন্থের সাফল্যের পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচিত হবে। সুচিন্তিত মতামত হোক চলার ও বলার পাথেয়। (চলবে)

অন্যধারা/সাগর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here