তালেবানের ইতিহাস- উত্থান পতন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বর্তমান তালেবান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ‘তালেবান’ শব্দের অর্থ ‘ছাত্র’। তালেবান একটি সামরিক সংগঠন । ২০১৬ সাল থেকে মৌলভি হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা তালেবান নেতা।‌ ২০২১ সালের হিসাবে তালেবানের আনুমানিক ২,০০,০০০ যোদ্ধা রয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবান আফগানিস্তানে ৪ ভাগের ৩ ভাগের ক্ষমতায় ছিলো। ১৫ আগষ্ট ২০২১ মোল্লা আব্দুল গণির নেতৃত্ব আবারো আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে সংগঠনটি। (উইকিপিডিয়া)

তালেবানদের আন্দোলন হলো সুন্নি ইসলামি এবং পশতুন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। পশতুন আন্দোলন থেকেই মূলত তালেবান আন্দোলনের সূত্রপাত। ১৯৯৪ সালে আফগানিস্তানে তারা প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই আন্দোলনের প্রথম সূচনা হয় ধর্মীয় সভা-সেমিনার থেকে। তালেবানরা ক্ষমতায় গেলে পাকিস্তানের পশতুন এবং আফগানিস্তানে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং শরিয়া তথা ইসলামি আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার করে। তারা ইসলামি বিচার-ব্যবস্থার কথা বলে জনসমর্থন আদায়ে সমর্থ হয়। শুধু তাই নয়, তারা সাধারণ মানুষকে ইসলামি শরিয়া প্রতিপালন এবং নারীদের জন্য বোরকা পরিধান বাধ্যতামূলক করে। একইভাবে তালেবানরা টেলিভিশন, গান, সিনেমা ইত্যাদি বন্ধ করে দেয় এবং আট বছর বয়স থেকে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ করে।

এ আন্দোলনের প্রধান ছিলেন মোল্লা মুহাম্মাদ উমার। উমারের পরেই ছিল সামরিক কমান্ডার ও মাদ্রাসা শিক্ষকদের একটি মিশ্র ইউনিটের অবস্থান। এর পরে স্থান ছিল পদমর্যাদা অনুযায়ী পাকিস্তানের বিভিন্ন ধর্মীয় বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের। দক্ষিণ আফগানিস্তানের পশতুন অঞ্চল এবং পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু অঞ্চলে তালেবান আন্দোলন সবচেয়ে ব্যাপক রূপ ধারণ করেছিল। এ ছাড়া ইউরোপ ও চীন থেকে কিছু স্বেচ্ছাসেবক সে সময় এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তালেবানরা বিভিন্ন উত্স থেকে ভারী অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ-সহযোগিতা লাভ করেছিল। পাকিস্তান সরকার বিশেষত ইন্টার-সার্ভিস ইন্টেলিজেন্স তালেবানদের সহায়তার জন্য অভিযুক্ত হয়েছে।

২০০১ সালে ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর ৭ অক্টোবর মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনী আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায় এবং একই বছরের ডিসেম্বরে তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে।

ক্ষমতায় থাকার সময় তালেবান শরিয়াহ্‌ভিত্তিক ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৯৯৬ সালে তারা ক্ষমতায় আসার পর আফগানিস্তানে ইসলামি আমিরাত প্রতিষ্ঠা করে।  ২০০১ সালে নর্দার্ন অ্যালায়েন্স ও ন্যাটো জোটের যৌথ অভিযানে তালেবান সরকারের পতন হলেও পুরোপুরি শেষ করা যায় নি। বর্তমানে তারা শক্তিশালী অবস্থানে আছে। দীর্ঘ ২০ বছর যুদ্ধ করেও যুক্তরাষ্ট্র সফল হতে না পেরে অবশেষে তালেবান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে কিছু সেনা প্রত্যাহার করবে। সর্বশেষ গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ঘোষণা দিয়েছেন ‘আমেরিকার দীর্ঘতম লড়াই’ শেষ করতে আগামী ১ মে থেকে আফগানিস্তানে অবস্থানকারী মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শুরু হবে। অন্যদিকে, যুদ্ধে তালেবানরা জয়ী হয়েছে—বলে ঘোষণা দিয়েছেন তালেবান নেতা হাজী হেকমত।

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির এক গবেষণা রিপোর্ট অনুসারে গত ২০ বছরে আফগানিস্তানে যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ২.২৬ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। আফগানিস্তানের এখন অর্থনীতির যে আকার রয়েছে এই অর্থ তার ১০৫ গুণ। এই যুদ্ধে প্রাণহানি ঘটেছে দুই লাখ ৪১ হাজার জন, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সৈন্য রয়েছে তিন হাজার ৫৮৫ জন (আত্মহননের হিসাব এর বাইরে), আফগানিস্তানের সেনা ও পুলিশ সদস্য ৭৮ হাজার ৩১৪ জন, তালেবান ও সরকারের বিপক্ষের যোদ্ধা রয়েছে ৮৪ হাজার ১৯১ জন এবং বেসামরিক নাগরিক ৭১ হাজার ৩৪৪।

তালেবানদের এবারের ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে যে বিষয়টি বিশেষভাবে দেখা গেছে সেটি হলো, তারা ক্ষমা উদার মনোভাব অন্তর্ভুক্তিমূলক মানসিকতা আর মৌলিক বিষয়ে বিচ্যুত না হওয়ার নীতি অনুসরণ করেছে। ক্ষমতায় যাওয়ার পরও সেই নীতিই তারা অনুসরণ করবে বলে মনে হচ্ছে। তারা রাষ্ট্রের সব ধরনের পরিষেবা প্রদানকারী ব্যবস্থায় কর্মরতরা যেভাবে আছে সেভাবেই রাখবে এবং তাদের উদ্দীপ্ত করার জন্য ৫ শতাংশ বেতন বাড়িয়ে দেবে।

আফগানিস্তানের সেনাবাহিনীর সদস্য নিয়ে মিথ্যাচার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন  বলেছেন তিন লাখ সদস্যের আফগান সেনাবাহিনীকে কোটি কোটি ডলারের সরঞ্জাম দিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণ দেয়া সেনা সদস্যের সংখ্যা ৫০ হাজারেরও কম।

অন্যধারা/সাগর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here