লেখক ও ব্লগার গাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের ঢাকার সিপাহীবাগের বাসায় গত ২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার মধ্যরাতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ উঠেছে, উগ্র মৌলবাদীরা ধারালো দেশীয় অস্ত্রসহ সংঘবদ্ধভাবে তাঁর বাসায় হামলা চালায়।
এ সময় হামলাকারীরা লেখক ও ব্লগার গাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের বাবা এ কে এম শফিকুল ইসলাম ও মা মাকসুদা আক্তারকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন।
উক্ত হামলার বিষয়ে ভুক্তভোগীরা গত ২৩ সেপ্টেম্বর স্থানীয় থানায় অভিযোগ জানাতে গেলেও পুলিশ তা আমলে নেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা। ভুক্তভোগী লেখক ও ব্লগারের বাবা-মা জানান, এর আগেও তাদের বিভিন্ন ধরণের হুমকি, হেনস্থা, হয়রানি এবং লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঘনিষ্ঠ এক পারিবারিক সূত্র জানান – এসব ঘটনার প্রতিকার ও সহযোগিতা চেয়ে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে বিবিধ সময়ে আবেদন করেও কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি বলে তাঁরা জানান।
উল্লেখ্য, গত ২৩ সেপ্টেম্বর (বুধবার) বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায়, গাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতমূলক বক্তব্য তার ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট ও এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব লেখায় সমালোচনার নামে মহানবী (সাঃ) সম্পর্কে জঘন্য বিদ্রূপাত্মক বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানকে নিয়েও কুরুচিপূর্ণ ও মানহানিকর লেখা ও মন্তব্য প্রকাশ করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এর আগেও এই লেখক ও ব্লগারের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা এবং ঢাকার বাসায় একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি, ১৭ মার্চ ও ২ ডিসেম্বর হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। চলতি বছরেও ১১ ফেব্রুয়ারি এবং সর্বশেষ গত ২২ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে তাঁর বাসায় হামলার ঘটনা ঘটে।
এই লেখক ও ব্লগারের বিরুদ্ধে গত ২১ সেপ্টেম্বর (সোমবার) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়। আদালত অভিযোগটি আমলে নেন। পরবর্তী সময়ে সবুজবাগ থানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিআইডিকে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে লেখক ও ব্লগার গাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে। গোপালগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, রাজবাড়ী সদর আদালত, রাজবাড়ী চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ঢাকার মিরপুরের আদালতসহ ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে এসব মামলা চলমান রয়েছে বলে আদালত ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংফবাদের সূত্রে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী লেখকের পরিবারের সদস্যরা জানান, এ ধরনের হামলার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও তাঁদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
তাঁরা বলেন, ‘তাঁরা আমার ছেলেকে খুঁজছে। পেলে হত্যা করবে বলেছে। আমরা একটি ভীতিকর পরিবেশের মধ্যে বসবাস করছি। বিভিন্ন সময়ে এসে আমাদের মানসিক ও শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়। এমনকি ধারালো ছুরি গলায় ধরে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।’
তারা আরও জানান, আমার ছেলে যদি ইসলাম ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর ও বিদ্রূপাত্মক লেখা ও মন্তব্য করে থাকে, তা মুসলমান হিসেবে আমরাও সমর্থন করি না। তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও এসব ঘটনার পর আগের মতো নেই, দূরত্ব বেড়েছে। এবং আমরাও চাই, সে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে আল্লাহ-রাসুলের পথে ফিরে আসুক। অন্যথায় এমন ছেলের দরকার আমাদের নেই। তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করতে হবে।
হামলাকারীদের কাউকে তাঁরা শনাক্ত করতে পেরেছেন কি না—জানতে চাইলে পরিবারের সদস্যরা বলেন, ‘সবারই মুখ ঢাকা থাকে। মাথায় পাগড়ি ও পরনে জোব্বা থাকে। একেক সময় ভিন্ন ভিন্ন লোকজন আসে। তারা আমার ছেলেকে নাস্তিক ও মুরতাদ বলে। এমনকি তাকে হত্যা করা ফরজ ইবাদত হয়ে গেছে বলেও হুমকি দিয়েছে।’
ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, হামলাকারীরা তাঁদের হুমকি দিয়ে বলেছে, তাঁদের ছেলে যেন এ ধরনের লেখালেখি বন্ধ করেন এবং ইসলামের পথে ফিরে আসেন।
পরিবারের সদস্যরা আরও অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা ধারালো দেশীয় অস্ত্র ও চাপাতি দিয়ে তাঁদের বাসাবাড়িতে কুপিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে। ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছে। এ সময় তাঁদের শারীরিকভাবেও হেনস্তা করা হয়েছে বলে তাঁরা জানান।
গাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট, এক্স অ্যাকাউন্ট এবং তাঁর পরিচালিত গণমাধ্যম ‘দেশবার্তা’-য় ইসলাম ধর্ম, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও বিএনপির শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে কটূক্তিমূলক, অবমাননাকর এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে—এমন লেখা প্রকাশিত হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে। এসব লেখায় ধর্ম, মৌলবাদ, উগ্রবাদ, চরমপন্থা ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে তাঁর সমালোচনামূলক অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজে সমকামীসহ এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের সদস্যদের অধিকারের পক্ষেও তিনি সরব অবস্থান নিয়েছেন।
এদিকে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের বিষয়ে খিলগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবু সায়েম বলেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের এই দেশে লেখক ও ব্লগারের কার্যক্রম খুবই আপত্তিকর ও নিন্দনীয়। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা এরই মধ্যে চলমান রয়েছে। আদালত যে রায় দেবেন, তার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগটিও আমরা খতিয়ে দেখব।’
এদিকে লেখক ও ব্লগার গাজী সাইফুলের বিরুদ্ধে চলমান এসব মামলা ঘিরে বিভিন্ন সময়ে আদালত প্রাঙ্গণে বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনের মিছিল ও বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছে।

